logo
খবর

বিজয়ের মাস: ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১

রাশেদুর রহমান১১ ডিসেম্বর ২০২৪
Copied!
বিজয়ের মাস: ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১
যশোরে জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১। ছবি: সংগৃহীত

মুক্তাঞ্চলে প্রথম জনসভায় নজরুল–তাজউদ্দীন

মুক্ত যশোর শহরে এদিন এক জনসভার আয়োজন করা হয়। এটি ছিল মুক্তাঞ্চলে প্রথম জনসভা। আওয়ামী লীগ আয়োজিত এই জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বক্তব্য দেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, তাঁর সরকার বাংলাদেশের চারটি রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দল চারটি হলো মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম।

তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমরা আমাদের সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আজ যশোর যেমন মুক্ত, সমগ্র বাংলাদেশও তেমন মুক্ত হবে খুব শিগগির। আমাদের পরবর্তী কাজ হবে দেশ পুনর্গঠন করা।'

এর আগে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ যশোর শহরের টাউন হল ময়দানে পৌঁছালে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা জানায় বিপুলসংখ্যক মানুষ। তাঁরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন: ১. বাংলাদেশ সরকার ওয়ার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নরহত্যা, লুণ্ঠন, গৃহদাহ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে যুদ্ধবন্দীদের বিচার করবে। ২. ফেলে যাওয়া জমি ও দোকান ২৫ মার্চের আগের মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। চাষ হয়ে থাকলে চাষি বর্গাদার হিসেবে অর্ধেক ফলন পাবেন। ৩. যেকোনো ধর্মের যেকোনো নাগরিকের ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করলে কঠোর সাজা দেওয়া হবে।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ-ভাসানী) প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক বিবৃতিতে তাঁর দলের সদস্য ও সমর্থকদের বাংলাদেশ সরকার, আওয়ামী লীগ, মুক্তিবাহিনী এবং অন্য দল ও গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে একযোগে স্বাধীনতাসংগ্রামকে জোরদার করে তোলার নির্দেশ দেন।

পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের আবেদন

জাতিসংঘের একটি সূত্র এদিন জানায়, বাংলাদেশে নিয়োজিত একদল জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানি বাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিতে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর মাধ্যমে জাতিসংঘের সাহায্য চেয়েছেন। তারা বাংলাদেশে জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমের ফরাসি প্রধান পল মার্ক অঁরির মাধ্যমে জাতিসংঘের সাহায্য চান। অঁরি জাতিসংঘের মহাসচিবকে বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছেন। তবে জাতিসংঘে পাকিস্তানি প্রতিনিধি আগা শাহি মহাসচিবকে এ বার্তা গ্রাহ্য না করার অনুরোধ জানান।

কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং করপোরেশন জানায়, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান (পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের) অনুরোধে কান না দিতে একটি বার্তা পাঠালে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়।

ব্রিটেনের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদদাতা এদিন ঢাকা থেকে জানান, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিক আত্মসমর্পণের শর্তাবলি নির্ধারণের উদ্দেশ্য জাতিসংঘের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে আলোচনার জন্য যে প্রস্তাব পেশ করেন, তা নিয়ে ইয়াহিয়া খান আপত্তি জানিয়েছেন।

মুক্তিবাহিনী ও মিত্র ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গড়া যৌথ বাহিনী এদিন ঢাকার চারদিক কার্যত ঘিরে ফেলেছে। আকাশ ও জলপথে পাকিস্তানি বাহিনীর পালানোর পথ রুদ্ধ। বিভিন্ন স্থানে আত্মসমর্পণের পালা শুরু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জামালপুরে ৬০০, লাকসামে ৪৫০ এবং মেঘনার পুবে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৮০০ পাকিস্তানি যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ এদিন এক বেতার ঘোষণায় বলেন, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের পালানোর পথ বন্ধ করার জন্য ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যৌথ বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে এদিন বলা হয়, জামালপুর ও ময়মনসিংহের পতনের পর ঢাকার সংকট ঘনীভূত। উত্তর–পূর্বে যৌথ বাহিনী মেঘনা অতিক্রম করে ঢাকা অভিমুখী। অপেক্ষা এখন যৌথ বাহিনীর ঢাকা দখলের লড়াইয়ের।

যৌথ বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণের মুখে রাতে তুমুল যুদ্ধের পর কুষ্টিয়া শহর মুক্ত হয়। আগের দিন যৌথ বাহিনী ঝিনাইদহ থেকে ট্যাংক নিয়ে কুষ্টিয়া শহরে প্রবেশের মুখে পাকিস্তানি বাহিনীর ফাঁদে পড়েছিল। তখন শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। এরপর ভারতীয় বিমানের হামলায় পাকিস্তানি সেনারা হতাহতদের ফেলে সকালে পালিয়ে যায়। ঈশ্বরদী থেকে পালানোর সময় পাকিস্তানি সেনারা হার্ডিঞ্জ রেলসেতুর একাংশের গার্ডার ধ্বংস করে। যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর প্রায় ২০০ জন শহীদ হন।

যশোর থেকে ঢাকা অভিমুখী যৌথ বাহিনী মাগুরা শহর পেরিয়ে মধুমতি নদীর তীরে পৌঁছে যায়। নদীর ওপারে পাকিস্তানি সেনারা ঘাঁটি গেড়ে তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। খুলনা অঞ্চলে যৌথ বাহিনী এদিন খুলনা জেলা শহরের ১০ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়।

যৌথ বাহিনীর আরেক অংশ ভৈরব বাজারের দক্ষিণে সড়কপথ ধরে এগিয়ে যায় ঢাকার দিকে। চাঁদপুর ও কুমিল্লার মধ্যবর্তী লাকসামে ২৩ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও একটি বালুচ রেজিমেন্টের প্রায় ৪০০ পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে।

ময়মনসিংহ, জামালপুর, নোয়াখালী, হিলি, গাইবান্ধা, ফুলছড়ি, বাহাদুরাবাদ, দুর্গাদিঘি প্রভৃতি স্থান এদিন মুক্ত হয়। ভোরের আগেই পাকিস্তানি সেনারা ময়মনসিংহ শহর থেকে পালিয়ে যায়। মুক্ত হয় ময়মনসিংহ শহর। পালানোর সময় পাকিস্তানিরা শম্ভুগঞ্জ সেতু ধ্বংস করে। চাঁদপুরের মতলব এদিন মুক্ত হয়। পাকিস্তানি সেনারা সেখানে আত্মসমর্পণ করে।

পাকিস্তানি বাহিনীর সেনারা বেশির ভাগ স্থানেই যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই পারেনি। বাধা দেওয়ার চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তারা হয় পালিয়ে যায়, নয় আত্মসমর্পণ করে। গত ২৪ ঘণ্টায় আত্মসমর্পণ করে প্রায় দুই হাজার পাকিস্তানি সেনা।

ঢাকায় এদিন

ঢাকা থেকে এদিন বিদেশি নাগরিকদের অপসারণের কথা থাকলেও পাকিস্তানিদের বাধার মুখে সেটি স্থগিত হয়ে যায়। আগে থেকে কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষ দুটি ব্রিটিশ ও একটি কানাডীয় বিমানকে ঢাকা বিমানবন্দরে নামতে দেয়নি। জাতিসংঘের অনুরোধে ভারতীয় বিমানবাহিনী তেজগাঁও বিমানবন্দরে আক্রমণ বন্ধ রেখেছিল।

১১ ডিসেম্বর ভোর ৪টার দিকে পিপিআইর প্রধান প্রতিবেদক ও কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের প্রতিবেদক সৈয়দ নাজমুল হককে পুরানা পল্টনের বাসা থেকে এবং ভোর ৬টার দিকে দৈনিক পূর্বদেশের প্রধান প্রতিবেদক এ এন এম গোলাম মুস্তাফাকে গোপীবাগের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী।

১১ ডিসেম্বর দুপুর ৩টা থেকে ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়।

এদিন তেজগাঁও বিমানবন্দরে পাকিস্তানি সমরাস্ত্র ও বিমান বিধ্বংসী কামান পরিদর্শন শেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি বলেন, 'কোনো ক্রমেই শত্রুকে কাছে ঘেঁষতে দেওয়া চলবে না। এখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য পাকিস্তানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা।'

চীন যুদ্ধে জড়াবে না

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, পিকিংয়ের (বর্তমানে বেইজিং) কূটনৈতিক মহল বলছে, চীন শুধু জাতিসংঘের ভেতরেই পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে যাবে। সেনা পাঠিয়ে ভারত আক্রমণ করবে বলে মনে হয় না।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং নিউইয়র্ক যাওয়ার পথে এদিন লন্ডনে যাত্রাবিরতিকালে সাংবাদিকদের বলেন, জাতিসংঘকে তিনি জানাবেন যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতির মূল সমস্যা না মেটা পর্যন্ত এবং এ আলোচনায় বাংলাদেশকে না ডাকা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব অবাস্তব।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ডেমোক্র্যাট–দলীয় সিনেটর ফ্র্যাংক চার্চ ওয়াশিংটনে বলেন, পর্যাপ্ত সামরিক সাহায্য দেওয়ার জন্য পাকিস্তান অনুরোধ রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সন বিশেষ বিবেচনা করছেন।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১; দ্য সানডে টেলিগ্রাফ, ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১; দৈনিক পাকিস্তান ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১

আরও দেখুন

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাতে অংশ নিলেন রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাতে অংশ নিলেন রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী

জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একইসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। তাদের সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জামাতে অংশ নেন।

২ দিন আগে

সৌদিতে নিহত মোশাররফের দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ মন্ত্রণালয় বহন করবে: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী

সৌদিতে নিহত মোশাররফের দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ মন্ত্রণালয় বহন করবে: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী

মরদেহ হস্তান্তরকালে মন্ত্রী নিহত মোশাররফ হোসেনের পরিবারকে দাফন কার্য সম্পন্নের জন্য ৫০ হাজার টাকার চেক প্রদান করেন। এ ছাড়া, ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে ঈদের পর নিহতের পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করা হবে বলে তিনি জানান।

৩ দিন আগে

বাংলাদেশে ঈদ উদ্‌যাপিত হবে শনিবার

বাংলাদেশে ঈদ উদ্‌যাপিত হবে শনিবার

হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৯ বা ৩০ দিনে মাস হয়ে থাকে। ২৯ রমজান শেষে যদি চাঁদ দেখা যায়, তাহলে পরদিন ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হয়। আর চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হয়।

৪ দিন আগে

সমুদ্রপথে অবাধ ও বৈধ নৌচলাচলের পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত বাংলাদেশের

সমুদ্রপথে অবাধ ও বৈধ নৌচলাচলের পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত বাংলাদেশের

অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ডেপুটি হাইকমিশনার নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, যুদ্ধপ্রবণ এলাকায় চলাচলকারী জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি নাবিকসহ বিশ্বব্যাপী সমুদ্রকর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন।

৪ দিন আগে