logo
মতামত

বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা১৩ জানুয়ারি ২০২৬
Copied!
বিজ্ঞান, ক্ষমতা ও গণতন্ত্র: আমরা কোন পথে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আজকের বিশ্বে বিজ্ঞান আর কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সম্পদ নয়। জ্ঞান উৎপাদন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। তবু ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও দিকনির্দেশ এখনো কেন্দ্রীভূত কয়েকটি রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে বিজ্ঞানকে কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা বিভ্রান্তিকর; এটি এখন নৈতিকতা, রাজনীতি ও মানবিক দায়িত্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মহাকাশ গবেষণা—সবখানেই তাদের প্রভাব স্পষ্ট। তবে এই অগ্রগতির বড় অংশ করপোরেট মুনাফা ও সামরিক কৌশলের সঙ্গে জড়িত। প্রশ্ন ওঠে—এই বিজ্ঞান মানবকল্যাণের জন্য, না ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য?

ইউরোপ তুলনামূলকভাবে ভিন্ন পথ নিয়েছে। তারা গতি কম হলেও নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিয়েছে। তথ্য সুরক্ষা, মানবাধিকার, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নে ইউরোপের অবস্থান দৃঢ়। এই মডেল চোখে কম পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে হয়তো বেশি নিরাপদ। এখানেই মূল প্রশ্ন—গতির চেয়ে দিকনির্দেশ কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

চীনের উত্থান এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন দ্রুত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। আজ তারা আর অনুকরণকারী নয়। তবে এই সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজরদারি, তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। ফলে চীনের বিজ্ঞান একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক।

এই তিন শক্তির অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সত্য সামনে আনে—বিজ্ঞান আজ আবিষ্কারের চেয়েও বেশি মূল্যবোধের প্রশ্ন। কে সিদ্ধান্ত নেবে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হবে? কে এর সুফল পাবে, আর কে বহন করবে এর ক্ষতি? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বিজ্ঞান মানবিক হবে কি না।

সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে চীনে আমেরিকার চেয়ে বেশি গবেষক কর্মরত। আন্তর্জাতিক গবেষণায় চীনা প্রকাশনার প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও চীনের উপস্থিতি বাড়ছে। বহু চীনা গবেষক বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরছেন, কারণ সেখানে তারা পাচ্ছেন অর্থায়ন, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সহায়তা।

তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে উদ্বেগও রয়েছে। ইউরোপের নীতিনির্ধারকেরা আশঙ্কা করছেন, গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে সংবেদনশীল প্রযুক্তি এমন ব্যবস্থার হাতে যেতে পারে যেখানে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা সীমিত। আবার অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, সহযোগিতা বন্ধ হলে ইউরোপ নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ বিজ্ঞান কখনোই বিচ্ছিন্ন পরিবেশে বিকশিত হয় না।

এই প্রসঙ্গে গণতন্ত্রের প্রশ্নটি অনিবার্য। চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তবু তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্রের নামে সংগ্রাম করেও স্বৈরাচারের ফাঁদে পড়ছে। এই বৈপরীত্য বোঝায়—গণতন্ত্র কোনো জাদু নয়, এটি একটি ব্যবস্থা। জবাবদিহি, নৈতিকতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্রও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে।

চীনের রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক। ক্ষমতাসীন দল বদলালেও দিকনির্দেশ বদলায় না। বিপরীতে বহু দেশে রাজনীতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও স্বল্পমেয়াদি। সেখানে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ গড়ে না, ভোট টিকিয়ে রাখে। ফলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, গণতন্ত্র নিজেই নিজের বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়।

সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি এখানেই—আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চাই, নাকি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে একে ব্যবহার করছি?

প্রকৃত সত্য হলো, ভবিষ্যৎ কোনো একক রাষ্ট্রের মালিকানায় নয়। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর—আমরা কি বিজ্ঞানকে মানুষের জন্য ব্যবহার করব, না মানুষকেই বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে পরিণত করব?

চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও মেধার সম্মান। আর গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন নৈতিক নেতৃত্ব, জবাবদিহি ও ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ। এই দুটি পথ একসঙ্গে না চললে উন্নয়ন মানবিক হবে না, আর গণতন্ত্রও স্বৈরাচার জন্ম দেবে। এটাই আজকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

আরও দেখুন

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

রুয়ান্ডার সমাজে দীর্ঘদিন ধরে হুতু ও তুতসি পরিচয় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই পরিচয়কে যখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো, তখন একটি সাধারণ সামাজিক বিভাজন ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নেয়।

১১ ঘণ্টা আগে

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো নিজেদের একটি ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে দেখব, নাকি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করব? জি৭-এর বার্তা আসলে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে।

১২ ঘণ্টা আগে

আব্বু আমার শুকতারা

আব্বু আমার শুকতারা

এশিয়ান বাবাদের কত রকম বাহানা শুনি। এটা খেতে পারেন না তো ওটা করে দিতে হয়। আম্মি চাকরিতে চলে যাওয়ার পর আমার আব্বু খুকির মার রান্না করা খাবার মাসের পর মাস খেয়েছেন, নিজের কাজ নিজে করেছেন, আমাদের একটা নিরাপদ জায়গায় মানুষ করেছেন। কোনো অভিযোগ শুনিনি।

১৩ ঘণ্টা আগে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। আমরা যদি বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব।

৪ দিন আগে