logo
মতামত

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

রফিক আহমদ খান, মালয়েশিয়া২০ মার্চ ২০২৬
Copied!
প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ প্রবাস জীবনে আছি। কত ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা পরবাসে কাটিয়ে দিলাম। প্রবাসে যে একেবারে আপনজন নেই, তেমন নয়। আপনজন অনেকেই আছেন। বন্ধু ও পরিচিত ঘনিষ্ঠজনের সংখ্যাও দেশের চেয়ে কম নয়। পরবাসেও আমাদের বিশাল একটা বাংলাদেশি কমিউনিটি আছে। কমিউনিটির বহু মানুষের সাথে চেনাজানা ও নানাভাবে ঘনিষ্ঠতা আছে। বেশ বড় একটা পরিচিত মহল থাকার পরও ঈদ এলেই হৃদয়-গহিনে একটা শূন্যতার ভাব বয়ে যায়। রোজা ২৫/২৬টার পর থেকে এই শূন্যতা অনুভব আস্তে আস্তে নাড়াচাড়া দেয়। অনেক কিছু থাকার পরও যেন এখানে কিছুই নেই। এই কিছুটা আসলে কী? হয়তো মা বাবা, দেশে থাকা ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া–প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও হাজারও পরিচিতজনের অনুপস্থিতি। সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি হচ্ছে দেশের মাটি। যা চিরদিনের জন্য হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে খাঁটি। এই খাঁটি মাটি হলো দেশের বাড়িঘর, পথঘাট, গাঁয়ের গাছপালা, হাটবাজারসহ আরও আরও কত কী!

শেষ রোজার ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজের পর থেকেই মালয়েশিয়ার মসজিদে-মসজিদে ঈদের তাকবির পড়া আরম্ভ হয়। সকল মসজিদ থেকে সুরেলা কণ্ঠে ভেসে আসে ঈদের তাকবির ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’। খুবই চমৎকারভাবে মসজিদে মসজিদে তাকবির পড়া হয়। আমার কাছে বিষ্ময়কর লাগে, মালয়েশিয়ার যত মসজিদে ঈদের তাকবির শুনেছি, মনে হয় সবার কণ্ঠ যেন একই! যেন রেকর্ড করা তাকবির বাজানো হচ্ছে। বাস্তবে তা নয়। সরাসরি তাকবির পাঠ করেন মসজিদের ঈমাম ও মুসল্লিরা। সবাই সেই মধুর সুরে। একই ছন্দে। কী যে ভালো লাগে তাদের (মালয়েশিয়ান) তাকবির পাঠ, তা লিখে বোঝানো যাবে না।

লেখক
লেখক

ঈদের সকালে আমরা ঘুম থেকে উঠি, গোসল করি, এটা সেটা করি, হালকা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাই, চা খাই, নতুন পাঞ্জাবি পায়জামা পরি। তারপর ঘর থেকে বের হই, মসজিদে যাই। আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগে থেকেই মসজিদের মাইকে ভেসে আসে ঈদের তাকবির। উপরোল্লিখিত কাজগুলো করতে থাকি তাকবির শুনতে শুনতে। মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের ভিড়ে বসে বসেও নামাজের আগ পর্যন্ত তাকবির শুনি।

মালায়দের কণ্ঠের ঈদ-তাকবিরে হৃদয়ছোঁয়া পবিত্র ভাব চলে আসে। বললাম হৃদয় ছোঁয়া ভাব, এই হৃদয় ছোঁয়া ভাবে সাথে সাথেই দুই চোখে জল টলমল করে। একেবারে সেই প্রবাস জীবনের শুরু থেকেই আমার এই অবস্থা। প্রবাসে দুই দশকের অধিক সময় কাটিয়ে দিলেও ঈদের তাকবির শোনার পর অনুভূতিটা সেই আগের মতোই রয়ে গেল। জীবনে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে কতকিছুই তো পরিবর্তন হয়ে যায়, বা পরিবর্তন হয়েছে। কত অনুভূতিরও পরিবর্তন হয়েছে, কোনো কোনো অনুভূতি চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু, ঈদের তাকবির শুনতে শুনতে বুকের মাঝের শূন্যতা অনুভবের বিষয়টা কোনো পরিবর্তনহীন স্থান দখল করে আছে।

লেখক
লেখক

দেশে শৈশবে শেষ রোজার ইফতার শেষে চাঁদ উঠেছে কি না দেখার জন্য আমরা হই চই করে দৌড়াতাম। পাড়ার বাইরে গিয়ে পশ্চিম আাকাশে তাকিয়ে দেখতাম, খুঁজতাম সদ্য ওঠা ঈদের বাঁকা চাঁদ। এখনো দেশে থাকলে গ্রামে ঈদের চাঁদ দেখার খবর শুনি ছোটদের কাছ থেকে। ছোটরা চাঁদ দেখে এসে বাড়ির উঠোনে এসে 'চাঁদ উঠেছে-চাঁদ উঠেছে, চাঁদ দেখা গেছে-চাঁদ দেখা গেছে' বলে আনন্দ করে। আর এই মালয়েশিয়ায় শেষ রোজার ইফতারের পর মসজিদের মাইকে ভেসে আসা তাকবিরেই বুঝতে পারি ঈদ শুরু হয়েছে। দেশে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যে দায়িত্ব পালন করে এখানে কুয়ালালামপুর শহরে সে দায়িত্ব যেন পালন করে মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মুসল্লিরা। পরের দেশে দূরের দেশে ঈদের খবরে মনে সে রকম খুশির জোয়ার আসে না। কেন আসে না? ওই যে বললাম, দেশের আপনজন, দেশের মাটি, পথঘাট ও চিরচেনা গ্রামবাসী-বন্ধুবান্ধব ছাড়া ঈদের আমেজ আসে না। তাই তো প্রবাসে ঈদ মানে লুকিয়ে রাখা আঁখিজল-চোখ টলমল।

তারপরও আলহামদুলিল্লাহ বলতেই হয়, প্রবাসেও অনেক আপনজন আছে, অনেক বন্ধু আছে, অসংখ্য পরিচিত মানুষ আছে। চারপাশে বহু পরিচিত মানুষের ভিড়ে থাকলে আঁখিজল উধাও হয়ে খুশির আমেজ কিছুটা হলেও আসে। সময়গুলো পার হয়ে যায় 'আগামী ঈদ দেশে করব, ইনশাআল্লাহ'—এই আশায়। পাঠক ও দেশে-প্রবাসের সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক। আসুন, আরেকবার ঈদের তাকবির পড়ি, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’। মালয়েশিয়ায় এই তাকবির পড়তে ও শুনতে ভীষণ রকম ভালো লাগে।

রফিক আহমদ খান: মালয়েশিয়াপ্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক। সিনিয়র সহসভাপতি বাংলাদেশ কমিউনিটি প্রেস ক্লাব, মালয়েশিয়া।

আরও দেখুন

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডিসি সারওয়ার আলমের মতো অফিসার কম, তবে শূন্য নয়। তিনি নিজেই একটা ব্র্যান্ড। সুতরাং তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তিনি এক সময় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বহু অসাধু ব্যবসায়ীকে জেলে পুরেছেন।

০৪ জুলাই ২০২৬

কিংবদন্তির জন্ম

কিংবদন্তির জন্ম

পেলে জানে হাজার মাইল দূরে তার বাবা অন্যের টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের খেলা দেখছেন। অথবা রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনছেন। পেলের মনে আছে আট বছর আগে কীভাবে তার বাবা কেঁদেছিলেন। সে তার বাবাকে এবারও কাঁদাতে চায়, তবে এবার যেন সেই অশ্রু হয় আনন্দের। গর্বের। স্বপ্ন পূরণের।

০৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

০২ জুলাই ২০২৬

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকটই একটি চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শেষ হয়নি। বর্তমান সমঝোতাও তার ব্যতিক্রম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না।

০২ জুলাই ২০২৬