logo
মতামত

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন৮ ঘণ্টা আগে
Copied!
জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে কিছু সম্মেলন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের ক্ষমতার মানচিত্র আঁকার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভার কোল ঘেঁষে ফ্রান্সের এভিয়ান-লো -ব্যাঁ শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ২০২৬ সালের জি–৭ সম্মেলন সম্ভবত সেই ধরনের একটি ঘটনা। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক ঋণ সংকট এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। কিন্তু ঘোষণাপত্রের অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল আরও গভীর বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আর শুধু বাজার বা বাণিজ্য নেই; বরং রয়েছে ভূরাজনীতি, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ।

গত তিন দশকের বিশ্বায়ন ছিল মূলত অর্থনীতিনির্ভর। পশ্চিমা পুঁজি, চীনা উৎপাদন এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের শ্রমশক্তি মিলে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছিল। সেই কাঠামোয় রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা নিরাপত্তাগত উদ্বেগকে অনেকাংশে পেছনে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ, কোভিড-পরবর্তী সরবরাহ সংকট এবং চীনের দ্রুত উত্থান পশ্চিমা বিশ্বকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এভিয়ান সম্মেলন সেই বাস্তবতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে জি–৭-এর নতুন জোট গঠনের সিদ্ধান্তকে অনেকে কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভূরাজনৈতিক ঘোষণা। বিংশ শতাব্দীতে যেমন তেল ছিল বৈশ্বিক শক্তির প্রধান ভিত্তি, একবিংশ শতাব্দীতে সেই জায়গা দখল করছে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, গ্রাফাইট ও বিরল মৃত্তিকা খনিজ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি কিংবা আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে এসব খনিজ। আর এই ক্ষেত্রেই চীনের আধিপত্য পশ্চিমা বিশ্বের কাছে কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

ফলে জি–৭-এর ভাষায় ‘ডি-রিস্কিং’ হলেও বাস্তবে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন পুনর্বিন্যাস। পশ্চিমা দেশগুলো এখন এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যেখানে সরবরাহ শৃঙ্খল রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ এবং কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। এর অর্থ হচ্ছে, বিশ্বায়নের যুগে গড়ে ওঠা মুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থা ধীরে ধীরে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়বে দক্ষিণ এশিয়ায়। কারণ অঞ্চলটি এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংযোগস্থল। ভারত মহাসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, কোয়াড, আইপিইএফ সবকিছুর কেন্দ্রেই কোনো না কোনোভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন, বেইজিং, ব্রাসেলস কিংবা টোকিও সবার দৃষ্টি এখন এই অঞ্চলের দিকে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় দেশটির পররাষ্ট্রনীতি উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বাণিজ্যকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতি আর আলাদা কোনো বিষয় নয়। যে সমুদ্রপথ দিয়ে রপ্তানি যায়, সেটি এখন কৌশলগত নিরাপত্তার প্রশ্ন; যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ আসে, সেটি এখন ভূরাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন; যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, সেটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এ কারণেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্যের কূটনীতি বজায় রাখা। একদিকে চীন অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। একই সময়ে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারে পরিণত হচ্ছে। এই বহুমাত্রিক বাস্তবতায় কোনো একক শক্তিকেন্দ্রের ওপর অতিনির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ভারত ইতিমধ্যে নতুন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব চীনের বিকল্প উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে দিল্লিকে দেখছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য ভারতের পথ অনুসরণ করাই একমাত্র সমাধান নয়। বরং আঞ্চলিক সংযোগ, সমুদ্র অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করাই হবে অধিক কার্যকর কৌশল।

লেখক
লেখক

জি–৭ সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক ঋণ সংকট নিয়ে উদ্বেগ। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার অনেক উন্নয়নশীল দেশ বর্তমানে ঋণচাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার নতুন সংস্কারের দাবি তুলছে। বাংলাদেশ এখনো সেই সংকটের কেন্দ্রে নয়, কিন্তু বৈশ্বিক সুদের হার, ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। ফলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জি–৭ সম্মেলন বিশ্বব্যবস্থার একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় বিশ্ব বিভক্ত ছিল মতাদর্শে। বর্তমান বিশ্ব বিভক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং কৌশলগত সম্পদের ভিত্তিতে। এটি হয়তো প্রচলিত অর্থে নতুন শীতল যুদ্ধ নয়, কিন্তু এর প্রতিযোগিতা আরও বিস্তৃত এবং জটিল। কারণ এখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু সীমান্ত নয়; বরং বাজার, তথ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কাঁচামালের উৎসও।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো নিজেদের একটি ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে দেখব, নাকি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করব? জি–৭-এর বার্তা আসলে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ আগামী বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হবে শুধু কে কত শক্তিশালী, তার ওপর নয়; বরং কে পরিবর্তিত বাস্তবতাকে কত দ্রুত বুঝতে এবং কাজে লাগাতে পারে, তার ওপরও।

এভিয়ানের ঘোষণাপত্র তাই কেবল জি–৭-এর একটি বিবৃতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার একটি খসড়া। আর সেই খসড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য লেখা রয়েছে একসঙ্গে সতর্কবার্তা, সুযোগ এবং কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার গল্প।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ

আরও দেখুন

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

রুয়ান্ডার সমাজে দীর্ঘদিন ধরে হুতু ও তুতসি পরিচয় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই পরিচয়কে যখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো, তখন একটি সাধারণ সামাজিক বিভাজন ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নেয়।

৭ ঘণ্টা আগে

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো নিজেদের একটি ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে দেখব, নাকি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করব? জি৭-এর বার্তা আসলে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে।

৮ ঘণ্টা আগে

আব্বু আমার শুকতারা

আব্বু আমার শুকতারা

এশিয়ান বাবাদের কত রকম বাহানা শুনি। এটা খেতে পারেন না তো ওটা করে দিতে হয়। আম্মি চাকরিতে চলে যাওয়ার পর আমার আব্বু খুকির মার রান্না করা খাবার মাসের পর মাস খেয়েছেন, নিজের কাজ নিজে করেছেন, আমাদের একটা নিরাপদ জায়গায় মানুষ করেছেন। কোনো অভিযোগ শুনিনি।

৯ ঘণ্টা আগে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। আমরা যদি বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব।

৪ দিন আগে