logo
খবর

বিজয়ের মাস: ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১

রাশেদুর রহমান০৩ ডিসেম্বর ২০২৪
Copied!
বিজয়ের মাস: ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১
প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত

সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা

বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ৩ ডিসেম্বর ভারতে আক্রমণ করে। পাকিস্তানের বিমানবাহিনী বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটে ভারতের ৭টি স্থানে অতর্কিতে একযোগে হামলা চালালে এদিন থেকে সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা হয়।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভারতে একতরফা আক্রমণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী ও মিত্র ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গড়া যৌথ বাহিনী এদিন থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশে অভিযান শুরু করে। যৌথ বাহিনী বাংলাদেশের পাকিস্তানি অবস্থানগুলো ঘিরে ফেলার জন্য সীমান্তের ৭টি এলাকা দিয়ে তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করে।

মুক্তিবাহিনীর কিলো ফ্লাইটের সফল অভিযান

মুক্তিবাহিনীর বিমান ইউনিট কিলো ফ্লাইটের সদস্যরা ভারতের কৈলাস বিমানঘাঁটি থেকে ৩ ডিসেম্বরের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করে সফল অভিযান চালান। রাত ২টায় ৩০০ ফুট উঁচুতে উড়ে শামসুল আলম (স্বাধীনতার পর বীর উত্তম) ও আকরাম আহমদের (স্বাধীনতার পর বীর উত্তম) নেতৃত্বে একটি বিমান চট্টগ্রাম তেলের ডিপো ধ্বংস করে দেয়। নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেলের ডিপোতে সফল আঘাত হানে সুলতান মাহমুদ ((স্বাধীনতার পর বীর উত্তম) ও বদরুল আলমের (স্বাধীনতার পর বীর উত্তম) নেতৃত্বে একটি হেলিকপ্টার।

সিলেটে ৪ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ভোরে কানাইঘাটের পাকিস্তানি ঘাঁটি আক্রমণ করেন। মুক্তিযোদ্ধারা তিন দিক থেকে আক্রমণ করলে সকাল ৭টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে শুরু করে। সাড়ে ৮টায় কানাইঘাট মুক্ত হয়। যুদ্ধে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হন।

মুক্তিযোদ্ধারা ৩ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার শমশেরনগরও মুক্ত করেন।

৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর ঠাকুরগাঁও শহর দখল করেন। এর আগে ২৯ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা পঞ্চগড় শত্রুমুক্ত করেন। পঞ্চগড় থেকে বিতাড়িত পাকিস্তানি সেনারা ঠাকুরগাঁওয়ে আশ্রয় নেয়। যৌথ বাহিনী সেতু সংস্কার করে ১ নভেম্বর ঠাকুরগাঁও শহরের কাছে পৌঁছে যায়। ২ ডিসেম্বর রাতে সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে। সকালে বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবেশ করেন।

ইন্দিরা গান্ধীর বেতার ভাষণ

ভারতে বিমান হামলার মাধ্যমে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু করার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতায়। রাতেই তিনি দিল্লিতে ফিরে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এরপর দেশবাসীর উদ্দেশে রাতে বেতারে ভাষণ দেন।

বেতার ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের এবং একই সঙ্গে ভারতের। ভারতবাসীকে তিনি দীর্ঘ কৃচ্ছ্রতা ও আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। তিনি বলেন, সারা বিশ্বের কাছে তিনি একটি জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ বন্ধ করার সমাধান চেয়েছিলেন। এ জনগোষ্ঠীর একমাত্র অপরাধ ছিল গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোটদান। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই, কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।’

ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানের বিমান আক্রমণের খবরে সোভিয়েত ইউনিয়ন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এদিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক কমিটির চেয়ারম্যান ডি পি ধরসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডিতে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পুরো ক্ষমতা দাবির শর্তে অসামরিক যৌথ মন্ত্রিসভায় বাঙালি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সহকারী প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণে তিনি রাজি আছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ফরাসি যুবকের বিমান ছিনতাই

৩ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় সকালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দরে জঁ ক্যা নামে এক ফরাসি যুবক পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করেন। ‘সিটি অব কুমিল্লা’ নামের বোয়িং-৭২০ বিমানটি ৩ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে যাত্রা করে। প্যারিস, রোম ও কায়রো হয়ে এটির করাচি যাওয়ার কথা ছিল।

প্যারিস থেকে এটিতে পাঁচজন যাত্রী ওঠেন। নিরাপত্তাব্যূহ পেরিয়ে তাঁদের সঙ্গে ২৮ বছর বয়সী যুবক জঁ ক্যাও বিমানটিতে উঠে বসেন। বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে পাইলট বিমান চালু করতেই জঁ ক্যা পিস্তল বের করে তাঁকে ইঞ্জিন বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বলেন, নির্দেশ না মানলে বোমা দিয়ে বিমান উড়িয়ে দেওয়া হবে। এরপর তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধরত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য বিমানটিতে ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী তুলে দেওয়ার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

বিমানবন্দরে দুটি ওষুধভর্তি গাড়ি হাজির হয়। চারজন পুলিশ গাড়ির স্বেচ্ছাসেবকের পোশাকে বিমানে ঢুকে রাত আটটায় জঁ ক্যাকে আটক করেন। ফরাসি লেখক আঁদ্রে মালরোর বক্তব্যে অনুপ্রাণিত জঁ ক্যা মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখার উপায় খুঁজতে গিয়ে জুন মাসে বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১; ‘দুঃসাহসী সেই ফরাসি মুক্তিযোদ্ধার সন্ধানে’, ইফতেখার মাহমুদ, প্রথম আলো, ২ জানুয়ারি ২০১৬।

আরও দেখুন

ফ্লোরিডায় হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বৃষ্টির প্রথম জানাজা সম্পন্ন

ফ্লোরিডায় হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বৃষ্টির প্রথম জানাজা সম্পন্ন

ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এই তথ্য জানিয়েছেন।

৫ ঘণ্টা আগে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে নিহত আরেক প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে নিহত আরেক প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে

মরদেহ গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এখন পর্যন্ত ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪ জনের লাশ আমরা গ্রহণ করেছি আর একজনের লাশ পরিবারের সম্মতিতে সৌদি আরবেই দাফন করা হয়েছে।

১ দিন আগে

লিমন ও বৃষ্টিকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি দিচ্ছে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়

লিমন ও বৃষ্টিকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি দিচ্ছে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্তকালীন সমাবর্তনে ৮ হাজার শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েশন হবে। সেখানেই লিমন ও বৃষ্টিকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হবে। বৃষ্টি ও লিমনের স্মরণে অনুষ্ঠানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে।

১ দিন আগে