logo
মতামত

একজন মোস্তাফিজ নয়, অপমানিত পুরো বাংলাদেশ

শাহাবুদ্দিন শুভ
শাহাবুদ্দিন শুভ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
Copied!
একজন মোস্তাফিজ নয়, অপমানিত পুরো বাংলাদেশ
মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি: রয়টার্স

এশিয়ায় ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়—এটি আবেগ, পরিচয় এবং এক ধরনের নীরব সামাজিক ঐক্যের নাম। যে উপমহাদেশে ভাষা, ধর্ম, রাজনীতি ও শ্রেণিগত বিভাজন মানুষকে প্রতিনিয়ত আলাদা করে রাখে, সেই ভূগোলেই ক্রিকেট এক অদৃশ্য সেতু তৈরি করে। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তান—যেকোনো দেশের খেলা চললে মানুষ ভুলে যায় দল-মত, ভুলে যায় মতাদর্শ। তখন সবাই একসাথে প্রার্থনা করে নিজের দেশের জন্য।

কিন্তু এই খাঁটি আবেগের জায়গাটিই যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে, তখন ক্রিকেট আর কেবল খেলা থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় বিতর্ক, বিভাজন ও সংকটের উৎস।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্রিকেটের এই ঐক্যবদ্ধ শক্তি আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। যেখানে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব, ঠিক সেখানেই ক্রিকেট ম্যাচ চললে পুরো দেশ এক হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্মীয়—সব বিভাজন তখন মাঠের বাইরে। একই চিত্র দেখা যায় ভারত ও পাকিস্তানেও।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই খাঁটি আবেগকে যদি রাষ্ট্রক্ষমতা সচেতনভাবে ব্যবহার করে, যদি ক্রিকেটকে বানানো হয় ভোটের হাতিয়ার, তবে কি সেই খেলাটি আর নিষ্পাপ থাকে?

এই প্রশ্ন আরও গভীর হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আসন্ন আইপিএল ২০২৬ মৌসুমের জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। পরে ইএসপিএন ক্রিকইনফোর প্রতিবেদনে জানানো হয়, কেকেআর আইপিএল ২০২৬-এর জন্য মোস্তাফিজুর রহমানকে তাদের দল থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত যদি সত্যিই রাজনৈতিক চাপ কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ফল হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একজন ক্রিকেটারের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো এশিয়ার ক্রিকেট সংস্কৃতির জন্য একটি অশনিসংকেত। কারণ এখানে প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা, সমতা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়ানীতির মৌলিক মূল্যবোধ নিয়ে।

একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার যদি রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে একটি লিগে খেলতে না পারেন, তাহলে সেই লিগের নিরপেক্ষতা নিয়েই স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—যদি একজন খেলোয়াড়ই নিরাপদ না হন, তবে ভবিষ্যতে অন্য দেশের দল বা খেলোয়াড়রা কতটা আস্থা নিয়ে সেখানে খেলতে যাবেন?

ক্রিকেট উপমহাদেশকে এক করেছিল। সীমান্ত পেরিয়ে বন্ধুত্বের ভাষা তৈরি করেছিল। আজ যদি সেই ক্রিকেটই বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে দায় শুধু কোনো একটি বোর্ড বা ফ্র্যাঞ্চাইজির নয়—দায় রাষ্ট্রীয় নীতিরও।

লেখক
লেখক

ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক ও জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব শশী থারুর তার এক কলামে স্পষ্ট করেই দেখিয়েছেন, ভারতে ক্রিকেট কীভাবে ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি শুধু একজন দর্শক হিসেবে নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তার অংশ। চাঁদে যান পাঠানো, জি-২০ সম্মেলন আয়োজন—সবকিছুর পর ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয় হলে সেটিকে “মোদি যুগের আরেকটি ঐতিহাসিক অর্জন” হিসেবে তুলে ধরার প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু হয়েছে।

শশী থারুর আরও ভয়াবহ একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, ভারত যদি হারে, তবে দলের মুসলিম খেলোয়াড়দের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। অর্থাৎ জয় হলে রাষ্ট্রের কৃতিত্ব, আর হার হলে সংখ্যালঘুদের দায়। এটি শুধু ক্রিকেট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নগ্ন প্রকাশ।

এই প্রেক্ষাপটেই দেখতে হয় বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাকে। আনন্দবাজার পত্রিকার খবর অনুযায়ী, আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মোস্তাফিজের ছবি সরিয়ে নেয়। ২৫ জনের স্কোয়াড হঠাৎ করে হয়ে যায় ২৪ জনের। কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নেই, নেই স্বচ্ছতা—শুধু রাজনৈতিক নীরবতা।

বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আইন ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এই ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সাম্প্রদায়িক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে একজন চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ম্যাচ আয়োজনের দাবিও তুলেছেন তিনি।

এখানে প্রশ্নটা শুধু মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া নয়। প্রশ্নটা আরও বড়—

  • একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার যদি ভারতে খেলতে নিরাপদ না হন,
  • তাহলে পুরো বাংলাদেশ দল কীভাবে সেখানে নিরাপদ থাকবে?
  • ক্রিকেট কি এখন আর ক্রীড়াক্ষেত্রের বিষয়, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষাগার?

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দায়ভার বাংলাদেশ বহন করবে কেন? নরেন্দ্র মোদি সরকার যদি সংখ্যালঘু বিদ্বেষ ও উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দিতে ক্রিকেটকে ব্যবহার করে, তার মূল্য কি এশিয়ার ক্রিকেটকেই দিতে হবে?

দুঃখজনক হলেও সত্য—এই পাল্টাপাল্টির ফলে এশিয়ার ক্রিকেটে একটি গভীর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। আর এই সংকটের প্রধান দায় এড়ানো যাবে না ভারতীয় রাষ্ট্রক্ষমতা, বিশেষ করে বর্তমান বিজেপি সরকারের।

একজন বাঙালি হিসেবে, একজন ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে আমি আহত। মোস্তাফিজ শুধু একজন খেলোয়াড় নন—তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, আমাদের পতাকা বহন করেন। তাকে অপমান মানে পুরো বাংলাদেশকেই অপমান করা।

আশা করি, ভারতের বিবেকবান মানুষ ও ক্রিকেট প্রশাসন ভুলটি বুঝবে। মোস্তাফিজুর রহমানকে আবার কলকাতা নাইট রাইডার্সে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কারণ ক্রিকেট যদি রাজনৈতিক প্রতিশোধের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে এই খেলাটি আর কাউকেই ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে না—বরং বিভক্তিই বাড়াবে।

ক্রিকেট বাঁচুক রাজনীতি থেকে।

ক্রিকেট থাকুক মানুষের জন্য।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইমেইল: <[email protected]>

আরও দেখুন

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

দোল পূর্ণিমায় শ্রী শ্রী মহানাম চর্চার অনুষ্ঠান। কৃষ্ণ কিংবা রাম নামের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে এ এক আয়োজন। দুই দিন ভাগবত পাঠ, তিন দিন নাম কীর্তন। শেষ দিনে লীলা কীর্তন। অনুষ্ঠানজুড়ে নিমাই-বিষ্ণুপ্রিয়া এবং রাধা-কৃষ্ণের পৌরাণিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ৬টি নাম কীর্তনের দল আমন্ত্রিত হয়েছিল এখানে।

১৫ ঘণ্টা আগে

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

আমার কাছে বিষ্ময়কর লাগে, মালয়েশিয়ার যত মসজিদে ঈদের তাকবির শুনেছি, মনে হয় সবার কণ্ঠ যেন একই! যেন রেকর্ড করা তাকবির বাজানো হচ্ছে। বাস্তবে তা নয়। সরাসরি তাকবির পাঠ করেন মসজিদের ঈমাম ও মুসল্লিরা। সবাই সেই মধুর সুরে। একই ছন্দে।

৩ দিন আগে

কবিতা: ভালো নেই আমরা

কবিতা: ভালো নেই আমরা

নিজের বিপরীতে চলছি আমি/ ঘন অন্ধকার/ তুমি অদেখা ছায়া/ তুমি ছায়ার তরঙ্গ,/ তুমি আদি এবং মৌলিক/ উপলব্ধির বদল তুমি,/ স্বপ্ন, ওটা মিথ্যে/ অপ্রতিরোধ্য সত্য হলো জীবন্ত স্পন্দন।

১১ দিন আগে

জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়

জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার শক্তি আসে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি থেকে। নাগরিক সমাজকে বাদ দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে তা মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে। ফলে জাতিসংঘ আরও দূরে সরে যাবে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে।

১১ দিন আগে