logo
মতামত

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন১৪ জানুয়ারি ২০২৬
Copied!
স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা বহু কণ্ঠ হঠাৎ করেই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। সংবাদ শিরোনামে ফিরে আসে সমালোচনামূলক ভাষা, টকশোতে শোনা যায় ভিন্নমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ে প্রশ্ন তোলার সাহস। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম কিছুটা স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই স্বাধীনতা কতটা গভীর, কতটা টেকসই, আর কতটা নিয়ন্ত্রিত?

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো একদিনে অর্জিত হয় না, আবার একটি ঘোষণায় পূর্ণতাও পায় না। ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে যে পরিবর্তন দেখা গেছে, তা মূলত আংশিক ও শর্তসাপেক্ষ। কিছু বিষয় নিয়ে এখন কথা বলা সম্ভব হলেও আজও রয়ে গেছে কিছু ‘অদৃশ্য সীমারেখা’, যা অতিক্রম করা কঠিন। রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও গণমাধ্যমের পারস্পরিক সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলার সময় আসেনি।

গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে গণমাধ্যমের ভূমিকা মৌলিক ও অনিবার্য। স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করাও সম্ভব হয় না। অথচ বাস্তবতা হলো—ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সম্পাদকীয় চাপ, মালিকানা কাঠামোর রাজনীতি এবং বিজ্ঞাপননির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এখনো নানা রকম আত্মনিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ আসে বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই।

৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে যে আশার আলো দেখা দিয়েছে, তা অনেকটাই এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত মুক্তি’। গণমাধ্যম কিছুটা হাঁটার জায়গা পেয়েছে, কিন্তু দৌড়ানোর সাহস এখনো সীমিত। ভিন্নমত প্রকাশ করা গেলেও সেই মত কত দূর পর্যন্ত যেতে পারবে—এই অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। ফলে স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তা এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়।

সহধর্মিণীর সঙ্গে লেখক
সহধর্মিণীর সঙ্গে লেখক

গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে। তাই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে কেবল প্রশাসনিক অনুমতির স্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তায় রূপ দেওয়া।

৫ আগস্ট একটি সম্ভাবনার দিন। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করতে হবে—নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নয়, স্বাধীনতার মাধ্যমে। প্রশ্নকে শত্রু ভাবলে চলবে না; বরং তাকে গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্যথায় আমরা হয়তো লিখতে পারব, বলতে পারব—কিন্তু সবটা নয়, সব সময় নয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

লেখক সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি

আরও দেখুন

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

রুয়ান্ডার সমাজে দীর্ঘদিন ধরে হুতু ও তুতসি পরিচয় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই পরিচয়কে যখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো, তখন একটি সাধারণ সামাজিক বিভাজন ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নেয়।

১৪ ঘণ্টা আগে

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো নিজেদের একটি ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে দেখব, নাকি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করব? জি৭-এর বার্তা আসলে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে।

১৫ ঘণ্টা আগে

আব্বু আমার শুকতারা

আব্বু আমার শুকতারা

এশিয়ান বাবাদের কত রকম বাহানা শুনি। এটা খেতে পারেন না তো ওটা করে দিতে হয়। আম্মি চাকরিতে চলে যাওয়ার পর আমার আব্বু খুকির মার রান্না করা খাবার মাসের পর মাস খেয়েছেন, নিজের কাজ নিজে করেছেন, আমাদের একটা নিরাপদ জায়গায় মানুষ করেছেন। কোনো অভিযোগ শুনিনি।

১৬ ঘণ্টা আগে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। আমরা যদি বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব।

৫ দিন আগে