logo
মতামত

প্রযুক্তি যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভাষাগত বিভ্রান্তি কেন?

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা৫ দিন আগে
Copied!
প্রযুক্তি যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভাষাগত বিভ্রান্তি কেন?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ নতুন কিছু নয়। নির্বাচন মানেই বিদেশি পর্যবেক্ষক, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সক্রিয় উপস্থিতি। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিদেশি সাংবাদিকদের কথোপকথন হওয়া স্বাভাবিক—বরং একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি প্রত্যাশিতও। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ভাষাগত দুর্বলতা, ভুল অনুবাদ কিংবা অসম্পূর্ণ বোঝাপড়ার কারণে প্রকৃত বক্তব্য বিকৃত হয়ে যায়।

বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইংরেজি ভাষায় সীমাবদ্ধতার কারণে থমকে যান। কখনো তারা নিজেদের বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারেন না, আবার কখনো ভুল শব্দচয়নে বক্তব্যের অর্থই বদলে যায়। এর ফল শুধু ব্যক্তিগত বিব্রতকর পরিস্থিতি নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, তার ওপর।

এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি ঢাকা-৮ আসনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন কভারেজের সময়। সেখানে দেখা গেছে, ৩টি পক্ষই নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। সাংবাদিক প্রশ্ন করছেন, কিন্তু প্রশ্নের প্রেক্ষাপট স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক নেতা উত্তর দিতে গিয়ে ভাষাগত জটিলতায় পড়ছেন, ফলে বক্তব্য অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। আর যিনি অনুবাদ করছেন, তিনি না বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য ধরতে পারছেন, না সাংবাদিকের প্রশ্নের সূক্ষ্মতা বোঝাতে পারছেন। ফলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের বিশৃঙ্খল যোগাযোগ—যেখানে কেউ কাউকে ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না, অথচ সেই কথোপকথন থেকেই পরবর্তীতে প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সমস্যাটি শুধু ভাষা জানা না-জানার নয়; এটি প্রস্তুতি, পেশাগত দক্ষতা এবং দায়িত্ববোধের সম্মিলিত ব্যর্থতা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—প্রযুক্তি যখন হাতের মুঠোয়, তখন এই ভাষাগত বিভ্রান্তি কেন কাটছে না?

আজকের দিনে ভাষান্তরের জন্য কার্যকর ও সহজলভ্য ডিজিটাল টুলের কোনো অভাব নেই। গুগল ট্রান্সলেট, ডিপএল, মাইক্রোসফট ট্রান্সলেট, গ্রামারলি কিংবা চ্যাটজিপিটির মতো অ্যাপ কয়েক সেকেন্ডেই বক্তব্য অনুবাদ করে দিতে পারে। এগুলো শুধু শব্দান্তর করে না; বরং বাক্যের প্রেক্ষাপট, অর্থ ও ভঙ্গিও ধরে রাখার চেষ্টা করে। চাইলে সাক্ষাৎকারের আগে নিজের বক্তব্য লিখে অনুবাদ করা যায়, যাচাই করা যায়, এমনকি সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর আগেভাগেই প্রস্তুত রাখা সম্ভব।

তারপরও যদি একজন রাজনৈতিক নেতাকর্মী বিদেশি সাংবাদিকের সামনে গিয়ে ভাষাগত সমস্যার কারণে নিজের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে না পারেন, তাহলে সেটিকে নিছক ভাষার সমস্যা বলা যাবে না। এটি প্রস্তুতির ঘাটতি, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং কখনো কখনো বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন না করারই প্রতিফলন।

এই সংকটের আরেকটি দিক আরও উদ্বেগজনক। শুধু বাংলাদেশি পক্ষই নয়, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি সাংবাদিকদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা যখন বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিবেদন করেন, তখন তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত প্রস্তুতি প্রত্যাশিত। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সাংবাদিক স্থানীয় ভাষা বোঝার জন্য দক্ষ অনুবাদক ব্যবহার করেন না, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেন না, কিংবা সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়াই প্রশ্ন করেন।

ফলে যা ঘটে, তা হলো দ্বিমুখী ব্যর্থতা। একদিকে রাজনৈতিক নেতাকর্মী তাদের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হন; অন্যদিকে সাংবাদিক সেই অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্যকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই প্রক্রিয়ায় সত্যের চেয়ে ভুল ধারণা, অর্ধসত্য কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট বর্ণনাই বেশি ছড়িয়ে পড়ে।

সমাধানের পথ অবশ্যই আছে এবং সেটি দুই পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকেই ভাবতে হবে।

রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য প্রথম ও প্রধান বিষয় হলো প্রস্তুতি। বিদেশি সাংবাদিকের সামনে দাঁড়ানো মানে ব্যক্তিগত মতামত দেওয়া নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, দাবি ও বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করা। সে ক্ষেত্রে ভাষাগত দুর্বলতা কোনো অজুহাত হতে পারে না।

অনুবাদ টুল ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া, সাক্ষাৎকারের আগে বক্তব্য লিখে নেওয়া, দলের পক্ষ থেকে মিডিয়া ব্রিফিং টিম গঠন করা এবং প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত দোভাষী ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি।

অন্যদিকে বিদেশি সাংবাদিকদেরও আত্মসমালোচনা জরুরি। প্রযুক্তির এই যুগে ভাষা না বোঝাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। স্থানীয় ভাষা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেওয়া, নির্ভরযোগ্য অনুবাদক ব্যবহার করা এবং বক্তব্য যাচাই না করে সিদ্ধান্ত টানা থেকে বিরত থাকা—এসবই পেশাগত সততার অংশ হওয়া উচিত।

সবশেষে বলা যায়, ভাষা এখানে মূল সমস্যা নয়। মূল সমস্যা হলো দায়িত্বহীনতা এবং প্রস্তুতির অভাব। প্রযুক্তি আমাদের হাতে সমাধান তুলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সত্যিই সঠিক তথ্য সঠিকভাবে তুলে ধরতে চাই, নাকি বিভ্রান্তির আড়ালেই আমাদের স্বস্তি?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের নির্বাচন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে মূল্যায়িত হবে, এবং সেই মূল্যায়ন কতটা ন্যায্য হবে।

রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ যখন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তখন সেই নির্বাচন কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপিত হচ্ছে—তার দায় শুধু রাজনীতিকদের নয়, সাংবাদিকতার প্রতিটি স্তরের ওপরও সমানভাবে বর্তায়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

রহমান মৃধা: গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।

ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।

২ দিন আগে

স্বপ্নের দেশে অভিবাসীর দুঃস্বপ্ন

স্বপ্নের দেশে অভিবাসীর দুঃস্বপ্ন

আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন এনেছে। অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী; ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও একসময় অভিবাসী ছিল।

৪ দিন আগে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সমাজের সন্ধিক্ষণে—বাংলাদেশ কি প্রস্তুত এআই যুগের জন্য?

৫ দিন আগে

প্রযুক্তি যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভাষাগত বিভ্রান্তি কেন?

প্রযুক্তি যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভাষাগত বিভ্রান্তি কেন?

রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য প্রথম ও প্রধান বিষয় হলো প্রস্তুতি। বিদেশি সাংবাদিকের সামনে দাঁড়ানো মানে ব্যক্তিগত মতামত দেওয়া নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, দাবি ও বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করা। সে ক্ষেত্রে ভাষাগত দুর্বলতা কোনো অজুহাত হতে পারে না।

৫ দিন আগে