logo
মতামত

বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবনমন: বৈশ্বিক মঞ্চে মর্যাদাহানি

শাহাবুদ্দিন শুভ
শাহাবুদ্দিন শুভ২৫ অক্টোবর ২০২৫
Copied!
বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবনমন: বৈশ্বিক মঞ্চে মর্যাদাহানি
ছবি: সংগৃহীত

কিছু খবর আছে, যা দেখলে বা শুনলে অজান্তেই মন খারাপ হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন সেই খবর আপনার নিজের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যখন দেখেন, আপনার দেশের মর্যাদা বিশ্ব পরিমণ্ডলে ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। প্রবাসী হিসেবে এমন সংবাদ শুনলে মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক।

আমি একজন ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে আমার। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলতেই হয়—বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বেশ হতাশাজনক।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বহুবার গিয়েছি। কিন্তু পৃথিবীর যেসব দেশে আমি গিয়েছি, তার মধ্যে ভারতের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাই সবচেয়ে খারাপ লেগেছে। মনে হয়েছে, তারা যেন বাংলাদেশের মানুষকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করে না।

বিদেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রতি বৈষম্য

২০১৪ সালের দিকে থাইল্যান্ড ভ্রমণের এক অভিজ্ঞতা আজও মনে পড়ে। রাতের ফ্লাইটে ব্যাংককে পৌঁছে ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, যাত্রীদের দেশ অনুযায়ী আলাদা লাইনে ভাগ করা হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তানের যাত্রীদের দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়া হলেও বাংলাদেশি যাত্রীদের আলাদা করে বসিয়ে রাখা হলো।

লেখক
লেখক

অপেক্ষার একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে আমি ইমিগ্রেশন অফিসারকে বললাম, ‘আপনাদের দেশে ঢুকতে না দিলে পরের বিমানে তুলে দিন, আমি ফিরতে রাজি।’ পরে এক কর্মকর্তা এসে আমার পাসপোর্ট দেখে পেশা জানতে চান, তারপর আমাকে ছাড়পত্র দেন। কিন্তু অন্য অনেক বাংলাদেশি তখনো সেখানে বসে ছিলেন।

এই অভিজ্ঞতা কেবল থাইল্যান্ডে নয়; ইউরোপের বহু দেশেও একই রকম। বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখামাত্রই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাদের আচরণে বোঝা যায়, পাসপোর্টের রং নয়—এর মানই আমাদের দেশের সম্মানকে প্রকাশ করে।

হেনলি পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবনমন

সম্প্রতি প্রকাশিত হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৫–এর তথ্য আরও হতাশাজনক। ২০২৫ সালের সর্বশেষ (৭ অক্টোবর) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ১০০তম স্থানে নেমে গেছে। ২০২৪ সালের শুরুতে এই অবস্থান ছিল ৯৭তম। অর্থাৎ, আমরা আরও তিন ধাপ পিছিয়েছি।

এই সূচকে বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে আছে আন্তর্জাতিকভাবে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত উত্তর কোরিয়া। এর ফলে বাংলাদেশের নাগরিকেরা এখন বিশ্বের ২২৭টি গন্তব্যের মধ্যে মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পাচ্ছেন—যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪২।

তুলনামূলকভাবে, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার এখনো বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে (৯৬তম স্থান)। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ৮৫তম, ভুটানের ৯২তম এবং থাইল্যান্ডের ৬৬তম। দুই দশক আগে, ২০০৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৮তম, যা আজ নাটকীয়ভাবে নিচে নেমে গেছে।

পাসপোর্টের মানের পতন ও নাগরিক ভোগান্তি

এই পরিসংখ্যানই যথেষ্ট নয়; বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাই বলে দেয় বাংলাদেশি পাসপোর্টের মান কোথায় দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি আমার এক বন্ধু তাঁর সন্তানকে নিয়ে পূর্ব এশিয়ার একটি দেশে গিয়েছিলেন স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে। অন্য দেশের যাত্রীরা আধা ঘণ্টার মধ্যে ইমিগ্রেশন পার হলেও তাদের তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যখন যাত্রীদের সকল তথ্য স্ক্রিনে দৃশ্যমান, তখনো বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখলেই কর্মকর্তারা অতিরিক্ত প্রশ্নবানে জর্জরিত করেন।

সমাধান কী হতে পারে

পাসপোর্টের মান কেবল একটি বইয়ের কভার নয়; এটি একটি দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রতিফলন। সরকারের উচিত বৈদেশিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়ায় এমন পরিবর্তন আনা, যাতে বিশ্ব বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতি আস্থা রাখতে পারে।

আজ সময় এসেছে ভেবে দেখার—আমরা কেন ক্রমাগত নিচের দিকে নামছি এবং কীভাবে আবার ওপরে উঠতে পারি।

কারণ, পাসপোর্টের মান শুধু কাগজের মান নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তার মর্যাদা বহন করে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

দোল পূর্ণিমায় শ্রী শ্রী মহানাম চর্চার অনুষ্ঠান। কৃষ্ণ কিংবা রাম নামের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে এ এক আয়োজন। দুই দিন ভাগবত পাঠ, তিন দিন নাম কীর্তন। শেষ দিনে লীলা কীর্তন। অনুষ্ঠানজুড়ে নিমাই-বিষ্ণুপ্রিয়া এবং রাধা-কৃষ্ণের পৌরাণিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ৬টি নাম কীর্তনের দল আমন্ত্রিত হয়েছিল এখানে।

১৫ ঘণ্টা আগে

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

আমার কাছে বিষ্ময়কর লাগে, মালয়েশিয়ার যত মসজিদে ঈদের তাকবির শুনেছি, মনে হয় সবার কণ্ঠ যেন একই! যেন রেকর্ড করা তাকবির বাজানো হচ্ছে। বাস্তবে তা নয়। সরাসরি তাকবির পাঠ করেন মসজিদের ঈমাম ও মুসল্লিরা। সবাই সেই মধুর সুরে। একই ছন্দে।

৩ দিন আগে

কবিতা: ভালো নেই আমরা

কবিতা: ভালো নেই আমরা

নিজের বিপরীতে চলছি আমি/ ঘন অন্ধকার/ তুমি অদেখা ছায়া/ তুমি ছায়ার তরঙ্গ,/ তুমি আদি এবং মৌলিক/ উপলব্ধির বদল তুমি,/ স্বপ্ন, ওটা মিথ্যে/ অপ্রতিরোধ্য সত্য হলো জীবন্ত স্পন্দন।

১১ দিন আগে

জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়

জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার শক্তি আসে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি থেকে। নাগরিক সমাজকে বাদ দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে তা মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে। ফলে জাতিসংঘ আরও দূরে সরে যাবে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে।

১১ দিন আগে