logo
মতামত

জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন১২ মার্চ ২০২৬
Copied!
জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অস্থির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ এক গভীর আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর্থিক ঘাটতি, কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এবং ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ সব মিলিয়ে সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। কিন্তু এই সংস্কারের নামে যদি নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ আরও সংকুচিত হয়, তবে তা হবে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার জন্য আত্মঘাতী।

জাতিসংঘ সনদের শুরুতেই বলা হয়েছে ‘আমরা, জাতিসংঘের জনগণ।’ অথচ বাস্তবে জাতিসংঘ আজও একটি প্রধানত আন্তঃসরকারি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে রাষ্ট্রই মুখ্য। বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও সামাজিক আন্দোলনগুলো বহু বছর ধরে মানবাধিকার, উন্নয়ন, পরিবেশ ও শান্তি ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চললেও তাদের কণ্ঠস্বর এখনো প্রান্তিক।

বিশ্বজুড়ে সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর। এই জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভোগান্তি ও দাবি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার কাজটি মূলত করে থাকে নাগরিক সমাজ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক রাষ্ট্র আজও নাগরিক সমাজকে অংশীদার হিসেবে নয়, বরং বিরক্তিকর এক শক্তি বা হুমকি হিসেবে দেখে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার ব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত অবশ্য আছে। মানবাধিকার পরিষদের অধীনে সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা (ইপিইউ) প্রক্রিয়ায় এনজিওদের অংশগ্রহণ রাষ্ট্রগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রক্রিয়া দেখিয়েছে নাগরিক সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করলে আলোচনা আরও বাস্তবধর্মী হয় এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বাড়ে।

লেখক
লেখক

তবে এই অংশগ্রহণ এখনো নড়বড়ে ও অনিশ্চিত। কিছু রাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে নাগরিক সমাজের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে চায় ভিসা জটিলতা, বক্তব্যের ওপর বিধিনিষেধ কিংবা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে। সংস্কারের নামে যদি এসব প্রবণতা আরও জোরদার হয়, তাহলে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার শক্তি আসে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি থেকে। নাগরিক সমাজকে বাদ দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে তা মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে। ফলে জাতিসংঘ আরও দূরে সরে যাবে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে।

নিশ্চয়ই জাতিসংঘকে সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে আরও উন্মুক্ত, আরও অংশগ্রহণমূলক। সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিক সমাজের পরিসর সংকুচিত করা নয়, বরং তাকে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করা। তবেই ‘আমরা, জাতিসংঘের জনগণ’ এই অঙ্গীকার কেবল স্লোগান নয়, বাস্তব সত্যে পরিণত হতে পারবে।


(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।

ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

রুয়ান্ডার সমাজে দীর্ঘদিন ধরে হুতু ও তুতসি পরিচয় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই পরিচয়কে যখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো, তখন একটি সাধারণ সামাজিক বিভাজন ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নেয়।

১১ ঘণ্টা আগে

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

জি–৭-এর বার্তা: নতুন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো নিজেদের একটি ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে দেখব, নাকি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করব? জি৭-এর বার্তা আসলে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে।

১২ ঘণ্টা আগে

আব্বু আমার শুকতারা

আব্বু আমার শুকতারা

এশিয়ান বাবাদের কত রকম বাহানা শুনি। এটা খেতে পারেন না তো ওটা করে দিতে হয়। আম্মি চাকরিতে চলে যাওয়ার পর আমার আব্বু খুকির মার রান্না করা খাবার মাসের পর মাস খেয়েছেন, নিজের কাজ নিজে করেছেন, আমাদের একটা নিরাপদ জায়গায় মানুষ করেছেন। কোনো অভিযোগ শুনিনি।

১৩ ঘণ্টা আগে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: দেশে দেশে

পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। আমরা যদি বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব।

৪ দিন আগে