logo
মতামত

মানি লন্ডারিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন৩০ মার্চ ২০২৬
Copied!
মানি লন্ডারিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে সম্প্রতি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কূটনৈতিক এই আলোচনা বিষয়টিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সুইস রাষ্ট্রদূতের মধ্যে বৈঠক নতুন রাজনৈতিক সদিচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়; তা হলো, কেবল ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব, পরিমাপযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলে রূপান্তর করা।

বাংলাদেশে মানি লন্ডারিং নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে যা পরিবর্তিত হয়েছে, তা হলো এর ব্যাপ্তি, জটিলতা ও প্রভাব। প্রচলিত পদ্ধতি যেমন ভুয়া বিলিং বা হুন্ডির পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে আরও জটিল প্রক্রিয়া—ডিজিটাল প্রতারণা, অনলাইন জালিয়াতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির অপব্যবহার। এই অবৈধ আর্থিক প্রবাহ এখন একটি আন্তঃদেশীয় হুমকিতে পরিণত হয়েছে, যা অর্থনীতি, সুশাসন ও জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করছে।

কূটনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির মতো সহযোগিতার উপকরণগুলোর কথা বলা হয়। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাদের কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার শক্তির ওপর। কারণ সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ, সমন্বিত তদন্ত এবং শক্তিশালী আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ এখনো কাঠামোগত দুর্বলতার সম্মুখীন।

প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। দুর্নীতি দমন কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো প্রায়শই আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে। তথ্য আদান-প্রদান ধীর, বিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মামলা বিদেশি বিচারব্যবস্থার মানে পৌঁছানোর আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবে আরও একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে; তা হলো, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর সীমিত ভূমিকা।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কূটনৈতিক মিশনগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এগুলোকে আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে হবে। সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোর একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে, যেখানে তারা সন্দেহজনক আর্থিক প্রবাহ নজরদারি করতে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে এবং তদন্তে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু বাস্তবে এই দায়িত্বগুলো প্রায়ই যথাযথভাবে পালন করা হয় না।

এই নিষ্ক্রিয়তার গুরুতর পরিণতি রয়েছে। অবৈধ আর্থিক নেটওয়ার্কগুলো যেগুলোর কিছু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যুক্ত, সহজেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দূতাবাসগুলোর সক্রিয় নজরদারির অভাবে এসব কার্যক্রম অনেক সময় নজর এড়িয়ে যায় বা সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত থাকে।

এই বাস্তবতায় দূতাবাসগুলোর ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি।

প্রথমত, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে তাদের একটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে স্বাগতিক দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা।

দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দূতাবাসগুলোর মূল্যায়নে নির্দিষ্ট সূচক থাকতে হবে যেমন তথ্যের গুণমান, সহযোগিতার কার্যকারিতা ও তদন্তে অবদান। জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকলে সংস্কার কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করতে হবে। বিচ্ছিন্ন তদন্ত মামলাকে দুর্বল করে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা নষ্ট করে।

সবশেষে, একটি সংবেদনশীল বিষয়ে নজর দিতে হবে; তা হলো, আইনের বাছাইকৃত প্রয়োগ। যখন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকে, তখন পক্ষপাতিত্বের ধারণা দেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল আর্থিক অপরাধের উত্থান। অনলাইন প্রতারণা এবং সীমান্তপারের জটিল আর্থিক কার্যক্রম মোকাবিলায় উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রশিক্ষিত, প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনগণের সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, কূটনীতির দরজা খুলতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক কঠোরতার বিকল্প নয়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধার ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ বন্ধ করতে চায়, তাহলে তাকে কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনি সংস্কার, কার্যকর সমন্বয় এবং দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।

এটা করতে না পারলে, এসব প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের লড়াই চলতে থাকবে বক্তৃতার বাইরে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার গভীরে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি।

ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডিসি সারওয়ার আলমের মতো অফিসার কম, তবে শূন্য নয়। তিনি নিজেই একটা ব্র্যান্ড। সুতরাং তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তিনি এক সময় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বহু অসাধু ব্যবসায়ীকে জেলে পুরেছেন।

০৪ জুলাই ২০২৬

কিংবদন্তির জন্ম

কিংবদন্তির জন্ম

পেলে জানে হাজার মাইল দূরে তার বাবা অন্যের টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের খেলা দেখছেন। অথবা রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনছেন। পেলের মনে আছে আট বছর আগে কীভাবে তার বাবা কেঁদেছিলেন। সে তার বাবাকে এবারও কাঁদাতে চায়, তবে এবার যেন সেই অশ্রু হয় আনন্দের। গর্বের। স্বপ্ন পূরণের।

০৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

০২ জুলাই ২০২৬

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকটই একটি চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শেষ হয়নি। বর্তমান সমঝোতাও তার ব্যতিক্রম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না।

০২ জুলাই ২০২৬