logo
মতামত

গণতন্ত্র, রাষ্ট্র ও আমাদের প্রতি অবিশ্বাসের বয়ান

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
Copied!
গণতন্ত্র, রাষ্ট্র ও আমাদের প্রতি অবিশ্বাসের বয়ান
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কিছু মানুষের বিদায় কেবল ব্যক্তিগত শোক নয়; তা আমাদের সমাজের সামনে আয়না ধরে। সম্প্রতি প্রয়াত ওসমান হাদির নীরব ও মর্যাদাপূর্ণ বিদায় আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—আমরা আসলে কোন ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে চাই।

এই শোকের সময়েই দেশের সীমানার বাইরে থেকে কিছু পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকের বক্তব্য চোখে পড়েছে, যেখানে সরাসরি না হলেও একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে—বাংলাদেশ নাকি গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত নয়। কখনো এই যুক্তি আসে শৃঙ্খলা বনাম বিশৃঙ্খলার ভাষায়, কখনো উন্নয়ন বনাম রাজনৈতিক অধিকারের তুলনায়। কিন্তু এই ধরনের বয়ান নতুন নয় এবং এটি গভীরভাবে সমস্যাজনক।

ইতিহাস দেখায়, গণতন্ত্র কখনো নিখুঁত সমাজের পুরস্কার হিসেবে আসে না। বরং এটি নিজেই একটি প্রক্রিয়া—ভুল, সংশোধন, সংঘাত ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে যার বিকাশ ঘটে। তাই প্রশ্নটি ‘আমরা গণতন্ত্রের যোগ্য কি না’—এভাবে তোলা ভুল। সঠিক প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়, যেখানে ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকবে, জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে।

যারা মনে করেন শক্ত হাতে শাসনই স্থিতিশীলতা আনে, তারা ভুলে যান—দমন দিয়ে নীরবতা আনা যায়, কিন্তু আস্থা তৈরি করা যায় না। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ভয়ভিত্তিক ও ব্যক্তিনির্ভর শাসনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকে না। কারণ সেখানে ভুল সংশোধনের শান্তিপূর্ণ পথ এবং ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি থাকে না।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হলো নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন তখনই অর্থবহ, যখন তা বিশ্বাসযোগ্য। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট রয়েছে, যার সমাধান কোনো একক পক্ষের সদিচ্ছায় নয়—প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ প্রশাসন, আইনের শাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—এই সবকিছু মিলেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ধারণাও এই আস্থার সংকট থেকেই এসেছে। এটি আদর্শ কোনো ব্যবস্থা নয়, কিন্তু কখনো কখনো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে যাওয়ার সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে। যে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেকে স্থায়ী ক্ষমতা হিসেবে নয়, বরং নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে চায়—তাকে আগাম ব্যর্থ ঘোষণা না করে অন্তত সুযোগ দেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর মতামত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই মতামত যদি প্রেক্ষাপট-বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি পুরো সমাজকে অবমূল্যায়ন করে, তবে তা সহায়ক না হয়ে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ একটি তরুণ রাষ্ট্র—অর্জনের পাশাপাশি যার গভীর চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

গণতন্ত্র কোনো নিখুঁত গন্তব্য নয়; এটি একটি চলমান যাত্রা। হোঁচট খাওয়া মানেই পথ হারিয়ে ফেলা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা তৈরি করছি, যা আমাদের আবার উঠে দাঁড়িয়ে সামনে এগোতে সাহায্য করবে?

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি

আরও দেখুন

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

দোল পূর্ণিমায় শ্রী শ্রী মহানাম চর্চার অনুষ্ঠান। কৃষ্ণ কিংবা রাম নামের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে এ এক আয়োজন। দুই দিন ভাগবত পাঠ, তিন দিন নাম কীর্তন। শেষ দিনে লীলা কীর্তন। অনুষ্ঠানজুড়ে নিমাই-বিষ্ণুপ্রিয়া এবং রাধা-কৃষ্ণের পৌরাণিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ৬টি নাম কীর্তনের দল আমন্ত্রিত হয়েছিল এখানে।

১৫ ঘণ্টা আগে

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

আমার কাছে বিষ্ময়কর লাগে, মালয়েশিয়ার যত মসজিদে ঈদের তাকবির শুনেছি, মনে হয় সবার কণ্ঠ যেন একই! যেন রেকর্ড করা তাকবির বাজানো হচ্ছে। বাস্তবে তা নয়। সরাসরি তাকবির পাঠ করেন মসজিদের ঈমাম ও মুসল্লিরা। সবাই সেই মধুর সুরে। একই ছন্দে।

৩ দিন আগে

কবিতা: ভালো নেই আমরা

কবিতা: ভালো নেই আমরা

নিজের বিপরীতে চলছি আমি/ ঘন অন্ধকার/ তুমি অদেখা ছায়া/ তুমি ছায়ার তরঙ্গ,/ তুমি আদি এবং মৌলিক/ উপলব্ধির বদল তুমি,/ স্বপ্ন, ওটা মিথ্যে/ অপ্রতিরোধ্য সত্য হলো জীবন্ত স্পন্দন।

১১ দিন আগে

জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়

জাতিসংঘ সংস্কার হোক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে নয়

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার শক্তি আসে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি থেকে। নাগরিক সমাজকে বাদ দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে তা মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে। ফলে জাতিসংঘ আরও দূরে সরে যাবে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে।

১১ দিন আগে