logo
মতামত

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র জানা, তবু ব্যর্থ কেন বাংলাদেশ

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা২০ জানুয়ারি ২০২৬
Copied!
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র জানা, তবু ব্যর্থ কেন বাংলাদেশ
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংকট নতুন নয়। কিন্তু এই পুরোনো প্রশ্নটি আজ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। আমরা জানি রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, তবু বারবার ব্যর্থ হচ্ছি কেন? এই ব্যর্থতা কোনো আদর্শগত শূন্যতা থেকে আসেনি। এসেছে সেই আদর্শগুলোকে বাস্তব রাজনীতিতে বাধ্যতামূলক না করার সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিগুলো নিয়ে মানবসভ্যতা বহু আগেই এক ধরনের ঐকমত্যে পৌঁছেছে। গ্রিক ও রোমান চিন্তাবিদ, ইসলামি দার্শনিক এবং ইউরোপের আলোকায়ন যুগের মনীষীরা প্রায় একই কথা বলেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার বা শক্তির প্রদর্শনী নয়; এটি একটি দক্ষতা ও নৈতিকতার ওপর দাঁড়ানো দায়িত্ব। জ্ঞান, নৈতিকতা, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা, জনস্বার্থে দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সক্ষমতাই একজন শাসকের মৌলিক যোগ্যতা।

যদি এগুলোই রাষ্ট্র পরিচালনার স্বীকৃত মূলমন্ত্র হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ কেন আজও এই মানদণ্ডে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ?

এই ব্যর্থতার শিকড় নিহিত রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক ধারার দীর্ঘস্থায়ী বিচ্যুতিতে।

বাংলাদেশের রাজনীতির সূচনা হয়েছিল গণরাজনীতির ভেতর দিয়ে। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রচিন্তা নির্মাণ করেছিল—রাষ্ট্র জনগণের, ক্ষমতা জনগণের সম্মতির ফল। কিন্তু স্বাধীনতার পর খুব দ্রুতই সেই ধারায় ছেদ পড়ে।

প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার আগেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। গণরাজনীতির জায়গা দখল করে নেয় সামরিক শাসন। জনগণের অংশগ্রহণের বদলে প্রতিষ্ঠিত হয় নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। ক্ষমতার বৈধতা আসে জবাবদিহি থেকে নয়, আদেশ ও বলপ্রয়োগ থেকে। এখানেই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র প্রথম বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ে।

পরবর্তীকালে সামরিক শাসনের অবসান হলেও গণতন্ত্র পূর্ণ অর্থে ফিরে আসেনি। রাজনীতি ধীরে ধীরে পরিবারতন্ত্রে রূপ নেয়। দল মানে আর আদর্শ নয়, দল মানে নাম ও বংশপরিচয়। নেতৃত্ব নির্ধারিত হতে থাকে উত্তরাধিকারসূত্রে। যোগ্যতার বদলে পরিচয় হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রবেশপথ। রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা আবারও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

এরপর যুক্ত হয় আরেকটি প্রবণতা—রাজনীতিতে ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাব ও দখল। রাষ্ট্র নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্র না থেকে পরিণত হয় লেনদেন ও সুবিধা বণ্টনের মঞ্চে। নীতি নির্ধারিত হয় জনস্বার্থে নয়, গোষ্ঠীস্বার্থে। রাষ্ট্র পরিচালনা একটি পেশা না থেকে এক ধরনের বিনিয়োগে রূপ নেয়।

এই তিনটি প্রবণতা—সামরিক শাসন, পরিবারতন্ত্র ও ব্যবসায়িক দখল—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিয়েছে। নির্বাচন আছে, কিন্তু প্রকৃত প্রতিযোগিতা ক্ষীণ। আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নির্বাচনী। প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সেগুলো ব্যক্তি ও ক্ষমতাকেন্দ্রনির্ভর।

এই বাস্তবতার মধ্যেই আজ দেখা যাচ্ছে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা—সংকীর্ণ ধর্মীয় বা মৌলবাদী চিন্তার রাজনৈতিক উত্থানের চেষ্টা। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং নৈতিক হতাশা থেকেই এর জন্ম।

কিন্তু এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র নয়; এর পাশে রয়েছে বৃহত্তর ভারত এবং একটি জটিল আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। সংকীর্ণ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা এই প্রেক্ষাপটে সংঘাত বাড়াতে পারে, কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং রাষ্ট্রকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

এই রাজনৈতিক বিচ্যুতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে সমাজ ও অর্থনীতিতে। দুর্নীতি এখানে আর ব্যতিক্রম নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা। কারণ ক্ষমতার জবাবদিহি দুর্বল। বেকারত্ব একটি গভীর সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। শিক্ষিত তরুণ সমাজ কাজ পায় না, আবার রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে কর্মসংস্থান নেই। এর ফলে তরুণদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।

এই তরুণেরা জানে না রাষ্ট্র তাদের কাছে কী দায়বদ্ধ, আর রাষ্ট্রও তাদের ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে যথাযথভাবে বিবেচনা করছে না।

এখানেই আবার ফিরে আসতে হয় মূল প্রশ্নে। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগুলো আমাদের অজানা নয়। সমস্যা হলো—আমরা কখনোই সেগুলোকে ক্ষমতার শর্ত বানাইনি। সেগুলো নৈতিক বক্তৃতার স্তরেই রয়ে গেছে। ফলে অযোগ্য নেতৃত্বও প্রশ্নহীনভাবে টিকে যেতে পারে।

আসন্ন নির্বাচন এই বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করাচ্ছে। নির্বাচন নিজে রাষ্ট্র বদলায় না। তবে নির্বাচন নাগরিকদের শেখাতে পারে। ভোট কোনো নিঃশর্ত অনুমতি নয়; ভোট একটি শর্তসাপেক্ষ দায়িত্ব অর্পণ।

যদি এই নির্বাচনেও প্রশ্ন না বদলায়, যদি জবাবদিহির দাবি স্পষ্ট না হয়, তাহলে রাজনৈতিক ধারার এই বিচ্যুতি চলতেই থাকবে। রূপ বদলাবে, নাম বদলাবে, কিন্তু সংকট বদলাবে না।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংকট কোনো আদর্শের অভাব নয়; এটি সাহসের সংকট। এই সাহস কেবল রাজনীতিবিদদের নয়—এই সাহস নাগরিক সমাজের, গণমাধ্যমের, শিক্ষাব্যবস্থার এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র কাগজে নয়, চর্চায় ফিরিয়ে আনার সাহস না থাকলে নির্বাচন থাকবে, রাষ্ট্র থাকবে—কিন্তু গণতন্ত্র থাকবে না।


লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডিসি সারওয়ার আলমের মতো অফিসার কম, তবে শূন্য নয়। তিনি নিজেই একটা ব্র্যান্ড। সুতরাং তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তিনি এক সময় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বহু অসাধু ব্যবসায়ীকে জেলে পুরেছেন।

০৪ জুলাই ২০২৬

কিংবদন্তির জন্ম

কিংবদন্তির জন্ম

পেলে জানে হাজার মাইল দূরে তার বাবা অন্যের টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের খেলা দেখছেন। অথবা রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনছেন। পেলের মনে আছে আট বছর আগে কীভাবে তার বাবা কেঁদেছিলেন। সে তার বাবাকে এবারও কাঁদাতে চায়, তবে এবার যেন সেই অশ্রু হয় আনন্দের। গর্বের। স্বপ্ন পূরণের।

০৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

০২ জুলাই ২০২৬

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকটই একটি চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শেষ হয়নি। বর্তমান সমঝোতাও তার ব্যতিক্রম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না।

০২ জুলাই ২০২৬