logo
মতামত

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা১১ ঘণ্টা আগে
Copied!
একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আমার নাম বাংলাদেশ। আমি শুধু একটি ভূখণ্ড নই—আমি এক জীবন্ত ইতিহাস, এক ভাষার মেলবন্ধন, এক জাতির আত্মপরিচয়। বহু প্রজন্ম আগে আমার যাত্রা শুরু, যখন এই মাটিতে ছিল ছোট ছোট রাজ্য, স্থানীয় নবাব ও রাজাদের শাসন। তখনই আমার মানুষের মনে জন্ম নিয়েছিল এক স্বপ্ন—একদিন তাদের মাটি, নদী, পাহাড় ও গ্রাম মিলিত হয়ে একটি পরিচিত নাম পাবে, যা স্বাধীনতা, শক্তি ও গর্বের প্রতীক হবে।

বাংলা ভাষা আমার প্রাণের ভিত, আমার আত্মার সুর। গ্রামের মাটির গন্ধ, নদীর কলকল ধ্বনি, বাজারের হাহাকার আর পাঠশালার পাঠ—সবকিছু মিলিয়েই এই ভাষার জন্ম। প্রতিটি শব্দে প্রতিফলিত হয়েছে আমার সন্তানের হাসি-কান্না, সংগ্রাম ও আশা। এই ভাষার ধারাতেই গড়ে উঠেছে আমার সংস্কৃতির ভিত্তি—যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে, লালিত হয়েছে।

দেশও বাংলা। আমার ভূখণ্ড, নদী, খাল ও পাহাড় মিলেই আমার জাতীয় পরিচয়। এই নাম, এই পরিচয়, এই গর্ব—আমি পেয়েছি আমার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। সাহসী কৃষক, চতুর বণিক, বীর সৈনিক, বিদ্বান পণ্ডিত, কবি ও শিক্ষক—সকলেই আমার মাটি, ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য লড়েছেন; অনেকে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের ত্যাগ, ধৈর্য ও দূরদর্শিতাই আমাকে আজকের বাংলাদেশ করে তুলেছে।

কিন্তু এই দেশ, এই সংস্কৃতি সহজে গড়ে ওঠেনি। শতাব্দীর শোষণ, বিদেশি শাসন, বিভাজন, দমন ও অত্যাচারের মধ্য দিয়েই আমাকে এগোতে হয়েছে। তবু আমার সন্তানেরা হার মানেনি। নবাব সিরাজদৌলার সময়েই তারা স্বাধীনতার স্বাদ প্রথম উপলব্ধি করে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর পরাজয় ছিল বেদনাদায়ক; কিন্তু সেই পরাজয়ের মধ্যেই জন্ম নেয় প্রতিরোধের বীজ—যা ভবিষ্যৎ সংগ্রামের ভিত্তি রচনা করে।

ব্রিটিশ শাসনামলে করবাজি ও নির্যাতনে গ্রামবাংলার জীবন বিপর্যস্ত হয়। মানুষের সংগ্রাম সীমাবদ্ধ ছিল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। তবু ধীরে ধীরে তারা বুঝে নেয়—স্বাধীনতার জন্য ক্ষুধার পাশাপাশি দরকার সচেতনতা, সংহতি ও সাহস। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী থেকে রণাঙ্গনের সৈনিক—সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ প্রমাণ করে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনো নিভে যায়নি। শিক্ষা ও সংস্কৃতি দমনের চেষ্টার মধ্যেও জ্ঞানের আলো লুকিয়ে রেখেছিল কলেজ, পাঠশালা, মসজিদ-মন্দির ও নদীর পাড়। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, ইকবাল ও নজরুল—তাদের চিন্তা ও কণ্ঠ আমার সন্তানদের সাহস ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।

১৯৪৭ সালের বিভাজন আমার বুকে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। ঘরছাড়া মানুষের কান্না ও লাঞ্ছনা আমার মাটিকে ভারী করে তোলে। আর ১৯৭১—ছিল চূড়ান্ত অধ্যায়। রক্ত ও অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমার সন্তানেরা আমাকে স্বাধীনতার আলো দেখায়। শহর-গ্রাম, নদী-পাহাড়—সবই তাদের ত্যাগের নীরব সাক্ষী।

স্বাধীনতার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের—যেখানে উর্বর মাটি, কর্মশক্তি ও মানবিক মর্যাদা মিলেমিশে উন্নতির পথ দেখাবে। ‘সোনার বাংলা’ নামে পরিচিত এই দেশে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকবে আলো, প্রত্যেক হৃদয়ে থাকবে সম্ভাবনা।

কিন্তু প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ব্যবধান বড় হয়েছে। পঞ্চান্ন বছর পরও প্রশ্ন জাগে—কোথায় সেই উন্নত সমাজ? বিভেদ, হিংসা ও স্বার্থপরতা আমার বুকে বিষ ছড়িয়েছে। সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপেক্ষা, ঘৃণার রাজনীতি, দুর্নীতি, বেকারত্ব, মেধা পাচার, বৈষম্য, দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা—সব মিলিয়ে আমার আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত। দ্বৈত নৈতিকতা সমাজকে দিশাহীন করছে; স্বপ্নগুলো লজ্জায় আড়াল নিচ্ছে।

তবু আমি আশাহত নই। আমি চাই আমার সন্তানেরা ভুল স্বীকার করুক, সুশিক্ষা ও নৈতিকতায় শক্ত হোক, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ফিরিয়ে আনুক। তারা একসময় স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল—আজও তারা পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশকে এগিয়ে নিতে।

আমি চাই সেই বাংলাদেশ—যেখানে নির্বাচন মানে হবে অধিকার ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা; যেখানে ভয়ের বদলে সাহস ও বিশ্বাস রাজত্ব করবে। যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের ভূমি ও স্বপ্নের অধিকার অনুভব করবে।

আমি চাই সেই বাংলাদেশ—যেখানে প্রতিটি ভোর নতুন সূর্য নিয়ে আসে, রাতের অন্ধকার ভেঙে দিনের আলো মানুষের মুখে ছড়ায়। যেখানে স্লোগানের চেয়ে বিবেকের আগুন প্রজ্বলিত হয়; ক্ষুধার কান্না থেমে যায়; কৃষকের ঘামে জন্ম নেয় সম্মান; শ্রমিকের হাতে ওঠে আগামী দিনের পতাকা।

আমি চাই সেই বাংলাদেশ—যেখানে তরুণদের চোখে ভয় নয়, থাকবে প্রশ্ন করার সাহস। যেখানে আইন হবে ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি, রাষ্ট্র হবে সবার নিরাপদ ঘর। যেখানে ধর্ম, ভাষা বা পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানুষ মানুষকে চিনবে। ভয়ের জায়গায় থাকবে আলিঙ্গন, নবজাতকের কান্না হবে নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রথম সুর।

সেই বাংলাদেশ—আমি। জাগ্রত জনতার বাংলাদেশ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

রহমান মৃধা: গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

স্বাধীনতার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের—যেখানে উর্বর মাটি, কর্মশক্তি ও মানবিক মর্যাদা মিলেমিশে উন্নতির পথ দেখাবে। ‘সোনার বাংলা’ নামে পরিচিত এই দেশে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকবে আলো, প্রত্যেক হৃদয়ে থাকবে সম্ভাবনা।

১১ ঘণ্টা আগে

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।

৩ দিন আগে

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।

৮ দিন আগে

স্বপ্নের দেশে অভিবাসীর দুঃস্বপ্ন

স্বপ্নের দেশে অভিবাসীর দুঃস্বপ্ন

আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন এনেছে। অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী; ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও একসময় অভিবাসী ছিল।

১০ দিন আগে